জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ওয়ান গ্রাম গোল্ড’

স্বর্ণের রেকর্ড দাম বদলে দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার গহনার বাজার

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় স্বর্ণের চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

খাঁটি স্বর্ণের বদলে ‘ওয়ান গ্রাম’ গোল্ড প্লেটেড বা ইমিটেশন গহনার দিকে ঝুঁকছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মূলত আভিজাত্য বজায় রেখে আর্থিক চাপ সামলাতেই এমন বিকল্প বেছে নিচ্ছে তারা। খবর আলজাজিরা।

দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে স্বর্ণ কেবল অলংকার নয়, বরং এটি সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। তবে বর্তমানে স্বর্ণের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া গহনার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। এসব গহনার নকশা খাঁটি স্বর্ণের মতোই নিখুঁত হলেও দাম অনেক কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজারের চিত্র এখন বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৭ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ ডলার (প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা) কাছাকাছি পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ের তুলনায় স্বর্ণের এ দাম অনেক বেশি। ঢাকার চকবাজার বা নিউমার্কেটের মতো পাইকারি ও খুচরা গহনার বাজারগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ ক্রেতারা এখন আর আগের মতো অনায়াসেই স্বর্ণের গহনা কিনতে পারছেন না।

ঢাকার ব্যবসায়ীরা জানান, গত কয়েক বছরে ইমিটেশন গহনার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে। যেখানে এক ভরি স্বর্ণের গহনার দাম আকাশছোঁয়া, সেখানে ইমিটেশন কানের দুল পাওয়া যায় মাত্র ২০০-৫০০ টাকায়। আবার পুরো ব্রাইডাল সেট কয়েক হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া সম্ভব। এসব গহনার বেশির ভাগই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। দামের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুরির ভয়ে অনেকেই এখন বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের গহনা পরার ঝুঁকি নিতে চান না।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে স্বর্ণের গহনার চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমেছে। অক্ষয় তৃতীয়ার মতো বড় উৎসবেও অনেক পরিবার খাঁটি স্বর্ণের বদলে ‘ওয়ান গ্রাম’ গহনা কিনেছে। এ গহনাগুলো মূলত অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি করে তার ওপর ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ দেয়া হয়। ফলে বিয়ের আসরে এটি দেখতে একেবারে আসল স্বর্ণের মতোই মনে হয়।

পাকিস্তানে গত এক বছরে স্বর্ণের গহনা বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। সেখানে বর্তমানে প্রতি তোলা স্বর্ণের দাম প্রায় ১ হাজার ৯৩৮ ডলার (প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি)। ফলে সাধারণ পরিবারগুলো ঐতিহ্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে এখন ১৮ বা ১২ ক্যারেটের গহনা ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে পুরোপুরি গোল্ড প্লেটেড গহনার দিকে ঝুঁকছেন। পাকিস্তানে একটি গোল্ড প্লেটেড ব্রাইডাল সেটের দাম যেখানে ৪০-৬০ হাজার রুপি, সেখানে একই নকশার আসল স্বর্ণের সেটের দাম পড়ে কয়েক মিলিয়ন রুপি।

তবে বিকল্প গহনার জনপ্রিয়তা বাড়লেও এর আড়ালে সামাজিক সংকটও প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে কাশ্মীরের মতো অঞ্চলে স্বর্ণ দিতে না পারার কারণে অনেক সময় বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। স্বর্ণের উচ্চমূল্য ও যৌতুকের চাপের কারণে অনেক নারীর বিয়ে হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, স্বর্ণ সবসময়ই মূল্যবান ধাতু হিসেবে গণ্য হবে। তবে স্বর্ণ এখন ব্যবহারের চেয়ে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেই বেশি বিবেচিত হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশীয় বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোয় এখন ‘ওয়ান গ্রাম গোল্ড’ গহনাই সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।

আরও